প্রভাষকদের জন্য এক অভিশাপের নাম “অনুপাত” প্রথা

88

সু-শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, আর এই জাতিকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে অবিরাম সাহায্য করে যাচ্ছে বঞ্চিত ও অবহেলিত শিক্ষক সমাজ। এইজন্য শিক্ষকদের জাতি গড়ার কারিগর বলা হয়। দেশ গড়ার কারিগর হয়েও তাদেরকে বিভিন্ন বঞ্চনা ও মানসিক কষ্টে চাকরি করতে হয়। এই বঞ্চনার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বেসরকারি কলেজের প্রভাষকদের পদোন্নতিতে কুখ্যাত কালো আইন অনুপাত প্রথার (৫:২) প্রচলন।
কি আছে এই অনুপাত প্রথায়?
এমপিওভুক্ত বেসরকারি কলেজের প্রভাষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি বড় ইনডেমনিটি বা বাধা হলো অনুপাত প্রথা (৫:২),অর্থাৎ ৭ জন প্রভাষকের মধ্যে ২ জন হবেন সহকারী অধ্যাপক আর বাকী ৫ জন সারা জীবন প্রভাষক। শতকরা হিসেবে ২৮ ভাগ প্রভাষক সহকারী অধ্যাপক আর বাকী ৭২ ভাগ প্রভাষক আজীবন প্রভাষক। একই দিনে চাকরিতে যোগদান করে শুধুমাত্র বয়সের কারণে অর্থাৎ যার বয়স বেশী তিনি সমান অভিজ্ঞতা ও সমান শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে (ক্ষেত্র বিশেষে কম যোগ্যতা) সহকারী অধ্যাপক হয়ে যাচ্ছে আর বাকী প্রভাষকরা সারা জীবন প্রভাষক হয়ে মনোকষ্ট নিয়ে অবসরে যাচ্ছে।ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে যেমন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার বিচার বন্ধ করা হয়েছিল তেমনি করে অনুপাত প্রথা দিয়ে যুগের পর যুগ বেসরকারি কলেজের প্রভাষকদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি বন্ধ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন যাবত বেসরকারি কলেজের প্রভাষকরা চাকরির ৮ বছর পূর্তিতে সহকারী অধ্যাপক ও ১২ বছর পূর্তিতে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য দাবী জানিয়ে আসলেও সরকার অনুপাত প্রথা বাতিল করেনি। শিক্ষা সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও অনুপাত প্রথা বাতিলের সুপারিশ করে,কিন্তু সরকারের পালা বদলেও কুখ্যাত অনুপাত প্রথা বাতিল হয়নি। বিভিন্ন সময় এমপিও নীতিমালা সংশোধনে কমিটি করা হলেও ২০১৮ সালের এমপিও নীতিমালার ১১-৪ অনুচ্ছেদে ৫:২ অনুপাত প্রথা বহাল রাখা হয়। অনুপাত প্রথা বহাল থাকায় বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজে অধ্যক্ষ/ উপাধ্যক্ষ নিয়োগে জটিলতা সৃস্টি হয়েছে। অধ্যক্ষ/ উপাধ্যক্ষ পদে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ার কারণে প্রায় অর্ধেক কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ দিয়ে প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা করতে হচ্ছে,ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে এক স্থবিরতা বিরাজ করছে। এই অনুপাত প্রথার কারণে একজন প্রভাষক চাকরিতে যোগদান করে প্রভাষক হিসেবেই অবসরে যাচ্ছে। এতে করে প্রভাষকরা আর্থিকভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তেমনি করে সামাজিকভাবেও তাদের মর্যাদাহানি হচ্ছে। এই অনুপাত প্রথার কারণে পিতাকে পুত্রের অধীনে চাকরি করতে হচ্ছে। পিতা যদি কোনো বড় কলেজে চাকরি করে তাহলে সারা জীবন প্রভাষক,আর পুত্র নতুন কলেজে যোগদান করে ৮ বছর পর সহকারী অধ্যাপক ও পরবর্তীতে অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ হয়ে যাচ্ছে। অনুপাত প্রথার কারণে একজন প্রভাষককে তাঁর ছাত্রের অধীনে চাকরি করতে হচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে ছাত্রকে স্যার ডাকতে হচ্ছে শিক্ষককে।সম্প্রতি এমপিও নীতিমালা সংশোধনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হলেও অনুপাত প্রথা বাতিলে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি, বরং শর্তের বেড়াজালে আরো নতুন নতুন শর্ত আরোপ করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা অবগত হয়েছি। নীতিমালা সংশোধনী কমিটি প্রভাষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে ১০০ নম্বরের কাল্পনিক শর্ত জুড়ে দেয়ার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে,যা শুভংঙ্করের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়। গবেষণার কথা বলা হচ্ছে,যেখানে বেসরকারি কলেজের প্রভাষকদের শিক্ষা ছুটি দেয়া হয় না,সেখানে গবেষণার জন্য নম্বর বন্টন অবাস্তব কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। এসিআর চালুর কথা বলা হচ্ছে,যেখানে বেশীরভাগ প্রতিষ্ঠানে অদক্ষ ও অযোগ্য পরিচালনা পরিষদের কথায় অধ্যক্ষ নিয়োগ হয় সেখানে কিভাবে বাস্তবসম্মত এসিআর পাওয়া যাবে তা ভাবার বিষয়! তাছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের প্রভাষকরা সহকারী অধ্যাপক হতে পারবেন না এমন আইনের খসড়া প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন নীতিমালায়। বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) চট্টগ্রাম মহানগর শাখার পক্ষ হতে এমন ঘৃণ্য প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা জানাই। বাকবিশিস দীর্ঘদিন যাবত অনুপাত প্রথা বাতিলের জন্য সভা,সেমিনার ও আন্দোলন করে যাচ্ছে। অনুপাত প্রথার কারণে কেউ ৩০ বছর চাকরি করেও অধ্যক্ষ হতে পারছেন না,আবার কেউ ১৫ বছর চাকরি করেই অধ্যক্ষ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, ফলে বঞ্চিত প্রভাষকরা পাঠদানে আগ্রহ হারাচ্ছে।পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যেখানে প্রভাষকদের পদোন্নতিতে এমন কালো আইন যুক্ত আছে,আসলে এটা জাতির জন্য লজ্জা ছাড়া আর কিছুই নয়, অথচ সরকারী কলেজের প্রভাষকরা নিয়মিতভাবেই ৮ বছর পূর্তিতে সহকারী অধ্যাপক ও ১২ বছরে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাচ্ছে। এক দেশে দুই আইন কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ভবিষ্যত প্রজন্মকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করতে মেধাবীদের এই মহান পেশায় আকৃষ্ঠ করতে হবে।আর আকৃষ্ঠ করতে হলে অনুপাত প্রথা বাতিলসহ শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যা দূরীভুত করা অত্যাবশ্যক। আর যদি এর ব্যত্যয় ঘটে তাহলে জাতিকে চরম মূল্য দিতে হবে। জাতিকে শত ভাগ শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে অনুপাত প্রথা বাতিলের কোনো বিকল্প নাই। তাই বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে প্রিয়নেত্রী, মানবতার মা, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসুরী শিক্ষা বান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা,মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপুমণি,মাননীয় শিক্ষা উপ-মন্ত্রী ব্যারিষ্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব জনাব মাহবুব হোসেনের কাছে বেসরকারি এমপিওভুক্ত প্রভাষকদের প্রাণের দাবী অনুপাত প্রথা বাতিল করে চাকরির ৮ বছর পূর্তিতে সহকারী অধ্যাপক এবং ১২ বছর পূর্তিতে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিয়ে অভিজ্ঞতার আলোকে অধ্যক্ষ/ উপাধ্যক্ষ নিয়োগের (২০১০ নীতিমালা বহাল) বিধান চালু করে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য দূরীভুত করার লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের জোর দাবী জানাচ্ছি।

“শিক্ষা দিবস দিচ্ছে ডাক শিক্ষাক্ষেত্রে সকল বৈষম্য নিপাত যাক”