প্রেমের স্বরূপ-প্রকৃতি,বিকাশ ও পরিণতি… মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন

270

 

এ.বি.এম.সিদ্দীকুল্যাহ সাগর
নোয়াখালী, জেলা প্রতিনিধিঃ
প্রতিটি মানুষের জীবনে প্রেম আসে, হয় সরবে নয়তো নীরবে। এজন্যে গানের মধ্যে বলতে শুনি ‘প্রেম একবার এসেছিলো নীরবে’। কারো জন্যে গোপনে, কারো জন্যে তা প্রকাশ্যে আসে। আসলে ‘প্রেম’ জিনিসটা কি ? এটাকে কোন ‘ফ্রেমে’ আবদ্ধ করা যায় কি না ? না তা কিন্তু নয়! কোন ব্যক্তি বা জিনিসের উপর মায়া, ভালবাসা ও আসক্তি বেড়ে যাওয়াই হলো প্রেম। অন্যভাবে- ‘নর-নারীর জৈবিক প্রবৃত্তি থেকে প্রেমের উৎস’ আর বলতে গেলে, ‘যে প্রেম মিলন মুখি নয়, তাতে আছে কেবল দাহ, মন-আত্মা, দেহের অপমৃত্যুই এর পরিণাম।’ তাই বলে কি সব প্রেম মিলনমুখি কিংবা দেহের অপমৃত্যু হয়ে থাকে? না তাও নয়, প্রেমের সূচকে নিম্নমুখী বা স্বার্থান্বেষী প্রেমের শতকরা হার বেশি। ঊর্ধ্বমুখী বা সত্যিকারের প্রেম বুঝতে গেলে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সহায়তা নিতে হয়! তবে সৃষ্টির প্রাণীকুল মাত্রই প্রেমের উপস্থিতি বিদ্যমান। পৃথিবীর সকল জীব কুলের মধ্যে প্রেমের এ অনিবার্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সাইকোলজিস্ট রবার্ট স্টেনবার্গ প্রেমকে তিনটি উপাদানের মধ্যে ভাগ করেছেন-
১.আবেগ
২.অন্তরঙ্গতা
৩.সহানুভূতি।

প্রেমের সাথে রূপের একটা সম্পর্ক রয়েছে। রূপের মোহে আচ্ছন্ন হয় না, এমন ব্যক্তি পৃথিবীতে বিরল। বঙ্কিমবাবুর ভাষায়- “রূপে মুগ্ধ? কে কার নয়! আমি এ হরিত নীল চিত্রিত প্রজাপতিটির রূপে মুগ্ধ, তুমি কুসুমিত কামিনী শাখার রূপে মুগ্ধ, রূপ তো মোহের জন্যেই সৃষ্টি।”আর এই মোহ থেকে হয়তো সেদিন গোবিন্দলাল বলেছিল- “এতোকাল গুণের সেবা করিয়াছি এখন কিছুকাল রূপের সেবা করিব, আর মাটির দেহ যেদিন ইচ্ছা ভাঙ্গিয়া ফেলিব।” এই রূপের মোহ মানুষকে চরম উৎকর্ষে নিয়ে যায়, হিতাহিত জ্ঞান শূন্য করে ফেলে। সংসারের মায়া মমতা ত্যাগ করে সংসার বিরাগী করে তোলে। মধ্যযুগের সাহিত্যে দেখা যায়, ‘মধুমালা’ কে স্বপ্ন দেখে মদন কুমার পাগল। লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ এর কথা বাদই দিলাম। সুখ পাখি যখন রাজা রত্নসেন কে বলে ‘পদ্মাবতীর রূপ কি কহিমু মহারাজ, তুলনা দিবারে নাহি ত্রিভুবন মাঝ’। তখন রত্নসেন রানী, রাজ্য ও প্রজাদের চিন্তা বাদ দিয়ে সেই রূপের মোহে পদ্মাবতীর খোঁজে ধাবিত হন। আবার সম্রাট আলাউদ্দিন সেই রূপের মোহে রত্নসেনের রাজ্য ধ্বংস করেন। রানি হেলেনা কে নিয়ে ট্রয় নগরী ধ্বংস হল। কৃষ্ণকুমারীকে নিয়ে পিতা ভীমসিংয়ের রাজ্য ধ্বংস হল। এছাড়া অমর প্রেমের মধ্যে বেহুলা-লক্ষিন্দর, রোমিও- জুলিয়েট, অডিয়াস-পেনেলোপ, দেবদাস-পার্বতী, ইউসুফ-জুলেখা উল্লেখযোগ্য। সীতা, রানী ক্লিওপেট্রা, রানী বিলকিস, আয়েশা, ডেসডিমোনা এসকল ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো এ মোহের পরিণতির প্রতিচ্ছবি। মমতাজের জন্য সম্রাট শাহজাহান প্রেমের চিরন্তন শিখা জ্বালিয়ে দিয়ে ‘তাজমহল’ গঠন করলেন। ভাঙ্গা-গড়ার অনেক ইতিহাস এই মোহ এবং প্রেম থেকে সংঘটিত হয়েছে। এরাবিয়ান নাইটস বা আরব্য রজনীর কাহিনীগুলোতে দেব-দৈত্তের হাত-পা ভেঙ্গে দিয়ে পাতালপুরী থেকে রাজকুমারী অথবা প্রেমিকাকে উদ্ধার করার দুঃসাহসী অভিযান দেখি। শুধু রুপকথার গল্প নয়, বাস্তবেও অনেক সময় রুপকথা কে হার মানায় এ রকম ঘটনা ঘটে। পিতা আদম (আঃ) এর সন্তান কাবিল, হাবিল কে হত্যা করেছে এ মোহের বশবর্তী হয়ে। সুতরাং বলা যায়, রূপের মোহ এবং তা থেকে প্রেম ও তার অনিবার্য পরিণতি ধ্রুব সত্য এবং বাস্তব বিষয়।

এ তো গেল বিপরীতধর্মী রক্তমাংসে গড়া নর-নারীর প্রেমের কথা, এবার মানবীয় প্রেমের কিছু চিত্র আলোকপাত করা যায়। বিপদগ্রস্ত যেই হোক না কেন, তার প্রতি অন্যদের একটা প্রেম জাগ্রত হয়। এটি হলো মানবিক প্রেম। জাতি, ধর্ম বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ ইত্যাদির ঊর্ধ্বে উঠে এই প্রেমকে স্থান দিতে হয়। বিশ্বের মানবতাবাদী সংগঠনগুলো এই প্রেমের জয়গান গেয়ে থাকেন। তাদের মতে মানবিক প্রেম চিরন্তন- অবিনশ্বর। আবার পিতা-মাতার প্রতি প্রেম, সন্তানের প্রেম, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, দেশ-জাতি ইত্যাদির প্রতিও এক অনিবার্য প্রেম লক্ষ্য করা যায়।

যা না থাকলে মানুষ হয়ে যেত অমানুষ। যাদের মধ্যে এ ধরনের প্রেম বা ভালোবাসা অনুপস্থিত, তারা কেবল হিংসা-বিদ্বেষ, জিগাংসা, পরশ্রীকাতরতা, ধ্বংস দিয়ে দুনিয়ায় অরাজগতা সৃষ্টি করে। ঔদ্ধত্য আর উম্মাদনা তাদের হৃদয় দখল করে সর্বদা। পৃথিবীতে এ ধরনের মানুষ কম, কিন্তু তাদের কর্মের ব্যাপকতা, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ মানুষ গুলোকে নীরব ও হতাশ করে তোলে। এই অবস্থায় মানবিক প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিটি মানুষ তার অন্তরাত্মাকে জাগ্রত করে, বিশ্বের বুকে তুলে ধরতে পারলেই, অশান্তি দূরীভূত হবে, শান্তির পতাকা উত্থিত হবে প্রতিটি দ্বারে দ্বারে। আসুন আমরা ঘৃণা পরিহার করি, মানুষকে ভালোবাসি, মানবিক প্রেমে পড়ি, তাহলে প্রশান্তির বীজ অঙ্কুরিত হয়ে সজীব হবে সমাজ, দেশ তথা এই ব্রহ্মাণ্ড।

এবার আসি প্রেমের যে দিকটি সবচেয়ে প্রবল গতিধারা সৃষ্টি করেছে, সে দিকটি সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক। আর তা হলো ধর্মীয় প্রেম। মধ্যযুগে শ্রীচৈতন্যদেব পরবর্তী সাহিত্যে শ্রীকৃষ্ণকে পাওয়ার জন্য শ্রীরাধার করুণ বিলাপ। শ্রীকৃষ্ণ যখন রাধাকে পাগল করে মথুরা (বৃন্দাবন) চলে যায় তখন রাধাকে অপ্রতিরোধ্য প্রেমে ব্যাকুল করে তোলে। রাধা যখন বলে, ‘হে সখি হামারি দুখের নাহি ওর, এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর।’ কিংবা ‘সই কেমনে বাঁধিব হিয়া, আমারি বধুয়া আন বাড়ি যায় আমারি আঙিনা দিয়া।’ এখানে আমরা যদিও দেখি রক্ত মাংসে গড়া শ্রী রাধা, শ্রী কৃষ্ণের প্রেমে পাগল কিন্তু সনাতন ধর্মালম্বীরা বলেন, পরমাত্মার প্রেম। শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মা আর রাধা হল জীবাত্মা, যা একান্তই দৈব। সব ভালোবাসা শরীরী হয় না, কিছু কিছু অশরীরীও হয়, এটা তার প্রমাণ।

আবার আমরা ইসলাম ধর্মের অনুসারীগণ আল্লাহ এবং তার রাসুল (সঃ) কে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। সেখানে স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, প্রেমিক-প্রেমিকা সকল ভালোবাসার উর্ধে উঠে স্থান দিতে হয় আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ)কে। তার প্রমাণ যুগে যুগে মুসলিমগণ দিয়েছেন।

তার প্রমাণ যুগে যুগে মুসলিমগণ দিয়েছেন। বদর, ওহুদ, খন্দক, হুনায়ুন ইত্যাদি যুদ্ধে সাহাবাগণ বাসর শয্যা ত্যাগ করে, পৃথিবীর সকল ভালোবাসা আর প্রেম কে উপেক্ষা করে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রেমে পড়ে যুদ্ধে গিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন। পরমাত্মার প্রতি জীবাত্মার এ প্রেম একেবারেই অপ্রতিরোধ্য। কথিত আছে,ওয়াইজ কারনি (রঃ) আ নবী (সঃ)’র একটি দন্ত ভেঙ্গেছে শুনে, কোনটি নির্দিষ্ট না হওয়ায় তার সকল দন্ত নিজে ভেঙ্গেছেন। এটা ছিল তাঁর রাসূল (সঃ)’র প্রতি প্রেমের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এখনো পৃথিবীতে বহু আল্লাহ প্রেমি ও রাসূল প্রেমি বিদ্যমান, তা না হলে কেয়ামত হয়ে যেত বলে বিশ্বাস করি। এ শ্রেণীর মানুষের মধ্যে মানবপ্রেম, জাগতিক প্রেম, সকল প্রেমই খুঁজে পাওয়া যায়। আসুন আমরা প্রেমের স্বরূপ-প্রকৃতি, বিকাশ ও পরিণতি বিশ্লেষণ করে কোন শ্রেণীর প্রেমে মশগুল হব, তা সিদ্ধান্ত নিই। এই অর্থে আমরা সকলেই প্রেমিক এবং সকলেই প্রেমিকা। আর আমিও তিন প্রকার প্রেম জাগতিক, মানবিক, ধর্মীয় প্রেম সম্পর্কে বুঝাতে চেষ্টা করেছি, হয়েছে কী হয় নাই, তা পাঠকের বিচার্য বিষয়। ধন্যবাদ

লেখক- মোহাম্মদ  নিজাম উদ্দিন
প্রভাষক
চরবাটা ইসমাইলিয়া আমিল মাদ্রাসা।